নাব্যতা সংকটে রঙ্গারচরা-পাটলাই নদী খননের দাবিতে মানববন্ধন
- আপলোড সময় : ৩০-১০-২০২৬ ০৮:৩৬:২৫ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ৩০-১০-২০২৬ ০৮:৩৬:২৫ পূর্বাহ্ন
স্টাফ রিপোর্টার ::
তাহিরপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী বাগলী শুল্ক স্টেশনের নৌবাণিজ্য এখন রঙ্গারচরা নদীর নাব্যতা সংকটে বিপর্যস্ত। নদীর তলদেশ পলি ও পাহাড়ি ঢলে ভেসে আসা পলি ও বালুতে ভরাট হয়ে যাওয়ায় শুষ্ক মৌসুমে ব্যাহত হচ্ছে কয়লা ও চুনাপাথর পরিবহন। পাটলাই নদীতে সৃষ্টি হচ্ছে নৌযানের দীর্ঘ জট। দিনের পর দিন পণ্যবোঝাই নৌকা ও বাল্কহেড আটকে থাকায় লোকসান গুনছেন আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীরা। অন্যদিকে বছরের বড় একটি সময় কাজ না থাকায় কর্মহীন হয়ে পড়ছেন কয়েক হাজার নৌশ্রমিক। পরিবার-পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবন কাটছে তাঁদের। এ পরিস্থিতিতে রঙ্গারচরা থেকে পাটলাই নদী খননের দাবিতে মানববন্ধন করেছেন শ্রমিক ও ব্যবসায়ীরা।
বৃহ¯পতিবার (২৯ অক্টোবর) দুপুরে বাগলী শুল্ক স্টেশনের এলসি পয়েন্টে আনলোড সমবায় সমিতির উদ্যোগে আয়োজিত মানববন্ধন থেকে নদী দুটির পরিকল্পিত গভীর খননের দাবি জানানো হয়। বক্তারা বলেন, নদী খনন করা না হলে নৌজটের স্থায়ী সমাধান হবে না, ফিরবে না শ্রমিকদের কর্মসংস্থানও।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উপজেলার বড়ছড়া, চারাগাঁও ও বাগলী শুল্ক স্টেশন দিয়ে ভারত থেকে আমদানি করা কয়লা ও চুনাপাথর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পরিবহন করা হয়। ভৈরব, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনাসহ বিভিন্ন গন্তব্যে এসব পণ্য পাঠানোর প্রধান মাধ্যম রঙ্গারচরা-পাটলাই নদীপথ। এলাকায় বিকল্প সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা না থাকায় আমদানি-রপ্তানিসংশ্লিষ্ট বাণিজ্য ও শ্রমিকদের জীবিকা অনেকটাই নির্ভরশীল এই নৌপথের ওপর।
বর্ষা মৌসুমে নদীতে পানি থাকায় কোনো রকমে নৌযান চলাচল করতে পারলেও শুষ্ক মৌসুমে পানির স্তর নেমে যাওয়ায় পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় ভারত থেকে পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে নেমে আসা পলি ও বালুতে নদীর তলদেশ ভরাট হওয়ার সমস্যা। নাব্যতা কমে যাওয়ায় পণ্যবোঝাই নৌযান চলাচলে বিঘ্ন ঘটে এবং পাটলাই নদীতে তৈরি হয় নৌজট। এতে পণ্য পরিবহনে দীর্ঘসূত্রতা, বাড়তি ব্যয় ও আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন ব্যবসায়ীরা। একই সঙ্গে নৌযান চলাচল কমে যাওয়ায় কাজ হারাচ্ছেন শ্রমিকেরা।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, প্রায় দেড় যুগ ধরে শুষ্ক মৌসুমে পাটলাই নদীতে নৌজটের সমস্যা দেখা দিলেও এর স্থায়ী সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। রঙ্গারচরা নদী ভরাট হয়ে যাওয়ায় সংকট আরও তীব্র হয়েছে। স্থানীয় শ্রমিক ও ব্যবসায়ীরা নিজস্ব অর্থায়নে নদী খননের উদ্যোগ নিলেও বিজিবির নিষেধাজ্ঞায় তা বাস্তবায়ন করা যায়নি বলে তাঁদের অভিযোগ। তাঁরা বলছেন, বিচ্ছিন্নভাবে খননের পরিবর্তে ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের আওতায় রঙ্গারচরা ও পাটলাই নদী পরিকল্পিতভাবে গভীর করে খনন করা প্রয়োজন।
বাগলী শুল্ক স্টেশন এলাকার ব্যবসায়ী ও বিএনপি নেতা শাহাদাত হোসেন বলেন, রঙ্গারচরা নদীর তলদেশ প্রায় পুরোপুরি ভরাট হয়ে গেছে। নদীটি খনন করা হলে নৌপথে পণ্য পরিবহন সহজ হবে, ব্যবসায়িক কার্যক্রম বাড়বে এবং শ্রমিকদের সারা বছরের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এতে সরকারের রাজস্ব আয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।
ব্যবসায়ী নুরুজ্জামান বলেন, রঙ্গারচরা থেকে পাটলাই নদী পর্যন্ত প্রায় সাড়ে সাত কিলোমিটার খনন করা হলে শ্রমিকদের কর্মসংস্থান বাড়বে এবং পাটলাই নদীর নৌজট সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব হবে।
বাগলী সমিতির কোষাধ্যক্ষ হাজী মো. আব্দুল আলীম বলেন, তিনটি শুল্ক স্টেশন দিয়ে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ কয়লা ও চুনাপাথর আমদানি করা হয়। এসব পণ্য পরিবহনে নৌজটের কারণে ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরে লোকসানের মুখে রয়েছেন। সরকারকে প্রতিবছর কোটি কোটি টাকা রাজস্ব দেওয়া হলেও নৌপথের নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। নদী খননের দাবি বারবার জানানো হলেও তা উপেক্ষিত থাকছে।
বাগলী শুল্ক স্টেশনের সভাপতি মো. কামাল হোসেন বলেন, পাটলাই নদীর নৌজট নিরসনের স্থায়ী সমাধান হলো রঙ্গারচরা ও পাটলাই নদী খনন। ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের আওতায় নদী খননের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে একাধিকবার দাবি জানানো হয়েছে। ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের দুর্ভোগ বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত খননকাজ শুরুর জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
তাহিরপুর কয়লা আমদানিকারক গ্রুপ সমিতির সভাপতি ও সাবেক চেয়ারম্যান মো. খসরুল আলম বলেন, নাব্যতা সংকটের কারণে বছরের মাত্র চার-পাঁচ মাস শ্রমিকেরা নদীতে কাজ করতে পারেন। বাকি ছয়-সাত মাস কর্মসংস্থান না থাকায় তাঁদের পরিবার-পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে হয়। রঙ্গারচরা থেকে পাটলাই নদী পর্যন্ত প্রায় সাত কিলোমিটার খননের জন্য সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুলের ডিও লেটার দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিনের দাবি বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগ কামনা করেন তিনি।
এ বিষয়ে সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলী মো. এমদাদুল হক বলেন, নদী খননের দায়িত্ব বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ)। তবে খননকাজ বাস্তবায়নে পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) তাপস শীল জানান, কিছুদিন আগে তিনি বড়ছড়া, চারাগাঁও ও বাগলী শুল্ক স্টেশন সরেজমিন পরিদর্শন করেছেন। ওই এলাকার সড়ক যোগাযোগব্যবস্থার অবস্থা ভালো নয়। রঙ্গারচরা নদীর নাব্যতা সংকটের স্থায়ী সমাধানে ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে গভীর খনন প্রয়োজন। এতে শ্রমিকদের সারা বছরের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
মানববন্ধনে বাগলী আমদানিকারক সমিতির সহসভাপতি হামিদুল ইসলাম, সহসাধারণ স¤পাদক হাবিবনুর সিদ্দিকী, আনলোড শ্রমিক সমিতির সভাপতি তাহের আলী, শ্রমিক নেতা চান মিয়া এবং ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসেন, আশ্রব আলী ও করিম মিয়াসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

স্টাফ রিপোর্টার, দৈনিক সুনামকণ্ঠ